ভারতে মাদারসন মোটরগাড়ি শ্রমিকদের ধর্মঘটকে মাওবাদী ইউনিয়ন নেতৃত্ব ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে রাখছে

মোসেস রাজকুমার ও শশী কুমার
২৫ অক্টোবর ২০১৯

মাসারসন অটোমোটিভ টেকনোলজিস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (এম-এ-টি-ই বা মেট)-এর শ্রমিকদের দ্বারা সংগঠিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট এখন তৃতীয় মাসে পড়ল। এই শ্রমিকদের নবনির্মিত ইউনিয়ন অল ইন্ডিয়া সেন্ট্রাল কাউন্সিল অব ট্রেড ইউনিয়নস (এ-আই-সি-সি-টি-ইউ)-এর শাখা। এ-আই-সি-সি-টি-ইউ শ্রমিকদের দ্বারা সংগঠিত এই ধর্মঘটকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে।

দক্ষিণ ভারতের তালিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাই থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে শ্রীপেরুম্বুদুরের মাদারসন কারখানার সঙ্গে যে ১৫০০ চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক এবং শিক্ষাণবিশ যুক্ত, এ-আই-সি-সি-টি-ইউ নেতৃত্ব তাদের ডাকতে রাজি হচ্ছে না। এর ফলে অন্য রাজ্য থেকে অস্থায়ী শ্রমিকদের নিয়ে ওই সংস্থা একই রকম ভাবে কাজ করে যেতে পারছে।

এ-আই-সি-সি-টি-ইউ এদের বিচ্ছিন্ন করায় সাহস পেয়ে মেট-এর পরিচালন সমিতি ধর্মঘটি শ্রমিকদের খুঁজে বের করার বিষয়ে আরও জোর দিয়েছে এবং ২৬শে আগস্ট ধর্মঘট শুরু হবার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ৪৪ জন শ্রমিকদের সাস্পেন্ড করেছে।

মাওবাদী ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি-মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী লিবারেশন (সি-পি-আই-এম-এল-লিবারেশন) এ-আই-সি-সি-টি-ইউ-কে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা শ্রীপেরুম্বুদুর শিল্পাঞ্চলে এবং ভারতের অন্য জায়গার অন্যান্য শ্রমিকদের তো ধর্মঘটি শ্রমিকদের সমর্থন করার আবেদন করছেই না, এমন কি মাদারসনের অস্থায়ী কর্মী ও প্রশিক্ষণার্থীদেরও আন্দোলনে যোগদান করাচ্ছে না। শ্রমিকদের বিভাজন করতে মেট যে চেষ্টা করছে, তার সঙ্গে সি-পি-আই-এম-এল-লিবারেশন-এর এই কাজ এর মিল রয়েছে।

মজুরি বৃদ্ধির জন্য লড়াই করতে, ভয়াবহ কর্মপরিবেশের সমাপ্তি ঘটাতে এবং পরিচালন সমিতি শ্রমিকদের ওপর যে মৌখিক নির্যাতন করে তা বন্ধ করতে মেট-এর স্থায়ী শ্রমিকরা তাদের নিজস্ব ইউনিয়ন - চেঙ্গাই আন্না মাভাট্টা জন ন্যায়াগা তোজিলালার সঙ্গম প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই নতুন ইউনিয়ন এ-আই-সি-সি-টি-ইউ-এর নথিভুক্ত হতে চেয়েছিল যাতে তাদের পরিচালন সংস্থার তরফ থেকে আর আক্রমণের শিকার না হতে হয়।

বিশ্বব্যাপী মোটরগাড়ি শিল্পের মন্দার জেরে ভারতের মোটরগাড়ি সংস্থাগুলিও সংকটের সম্মুখীন। ভারতীয় মোটরগাড়ি প্রস্তুতকারকদের সোসাইটির (সি-আই-এ-এম)-এর সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী যাত্রীবাহী গাড়ির বিক্রি ২৩.৬৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং বাণিজ্যিক যানবাহনের বিক্রি ৬২.১১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

ভারতের সর্ববৃহৎ মোটরগাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা, মারুতি সুজুকি ইন্ডিয়া, বিক্রি বাড়াতে তাদের কিছু মডেলের দাম কমাতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রথম বার তারা পর পর দুদিন তাদের উত্তর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের গুরুগ্রাম ও মানেসরের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল।

ক্রমাগত বেড়ে চলা মন্দার সময় মোটরগাড়ি প্রস্তুতকারক এবং মোটরগাড়ির অংশ প্রস্তুতকারকরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে এবং শ্রমিকদের ছাঁটাই করেছে। অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারস্‌ অ্যাসোশিয়েসন অব ইন্ডিয়া (এ-সি-এম-এ)-র সভাপতি রাম ভেঙ্কটরামানি মিডিয়াকে বলেন, "এই প্রবণতা যদি চলতে থাকে, তবে আনুমাণিক ১০ লক্ষ মানুষকে ছাঁটাই করা হতে পারে"।

মাদারসন পরিচালন বোর্ড মোটরগাড়ি শিল্পের ক্রমবর্ধমান সঙ্কট শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করছে তাদের ভয়াবহ কর্মাবস্থার মধ্যে কাজ করিয়ে।

ধর্মঘট ভাঙার চেষ্টা করতে এ-আই-সি-সি-টি-ইউ বলছে পরিচালন সমিতি যদি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তবে প্রধান সব দাবিগুলিকে বাদ দিয়ে দিতে পারে, আদতে যে দাবিগুলির ওপর ধর্মঘটটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু মেট-এর পরিচালন সমিতি তাদের দাবিতে অনড় থেকে অহংকারীর মতন কোনো দাবি ছাড়াই ধর্মঘটি শ্রমিকদের কাজে ফিরতে বলছে। এ-আই-সি-সি-টি-ইউ-এর যে একমাত্র দাবিটি এখনও রয়েছে - অর্থাৎ বরখাস্ত শ্রমিকদের পুণর্বহাল করা - তাও তারা সরাসরি নস্যাৎ করে দিয়েছে। তারা ক্রমাগত বলে চলেছে বরখাস্ত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে।

এ-আই-সি-সি-টি-ইউ ধর্মঘটি শ্রমিকদের সমগ্র ভারতে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে মোটরগাড়ি শিল্পের শ্রমিকদের কাছে আবেদন না করে দক্ষিণপন্থী এ-আই-এ-ডি-এম-কে-র নেতৃত্বাধীন তামিলনাড়ু সরকারের কাছে আবেদন করতে বলছে। ধর্মঘটের তাপ কমিয়ে দেবার জন্য তারা শ্রমিকদের অনশন ধর্মঘটের মতন অর্থহীন প্রতিবাদ করতে বলছে। ১৮ই অক্টোবর জেলা সদর কাঞ্চিপুরমে এ-আই-সি-সি-টি-ইউ-এর ডাকা অনশন ধর্মঘটে কম সংখ্যক শ্রমিক যোগ দেওয়া এটা বোঝায় যে এমন ফাঁপা ও বিভাজক প্রতিবাদে ধর্মঘটি শ্রমিকরা আর বিশ্বাস করে না।

১৮ই অক্টোবর শ্রমিকদের অনশন ধর্মঘটে এবং তারও আগে সেপ্টেম্বর ১৩ই শ্রীপেরুম্বুদুরে একটি প্রতিবাদ মিছিলে এ-আই-সি-সি-টি-ইউ জাতীয় সভাপতি এস.কুমারাস্বামী মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং এ-আই-এ-ডি-এম-কে-র নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতীয় আদালত ও লেবার কমিশন পুঁজিবাদীদের পক্ষ নিচ্ছে এবং শ্রমিকদের দুর্দশার প্রতি উদাসীন থাকছে। তিনি চিৎকার করে বলেন যে তাদের বিশ্বাস করা যাবে না। কিন্তু তার পরের মুহূর্তেই তিনি সেই একই কর্তৃপক্ষের প্রতি আবেদন করার জন্য প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

যে কংগ্রেস বহুদিন ধরে ভারতীয় বুর্জোয়াদের সরকারের পছন্দের দল ছিল, তিনটি স্তালীনপন্থী দল - সিপিএম, সিপিআই এবং সিপিআই-এম-এল-লিবারেশন - ২০১৯-এর জাতীয় নির্বাচনে সেই কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন করতে প্রস্তুত ছিল। মাওবাদী সিপিআই-এম-এল-লিবারেশন-এর প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি থেকেই এ-আই-সি-সি-টি-ইউ-এর নীতিগুলির সৃষ্টি হয়। সিপিআই-এম-এল-লিবারেশন দুটি প্রধান স্তালীনপন্থী সাংসদীয় দল - ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিএম এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই-এর সঙ্গে জোটে রয়েছে, যে জোট ইদানিংকালের বড় ব্যবসাদের দল ডি-এম-কে-র সঙ্গে নির্বাচনী জোট করেছিল। তাদের রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য আঞ্চলিক, সাম্প্রদায়িক ডি-এম-কে-র থেকে সি-পি-এম এবং সি-পি-আই যথাক্রমে ১০০০ লক্ষ টাকা এবং ১৫০০ লক্ষ টাকা পেয়েছিল।

সি-পি-আই-এম-এল-লিবারেশন এবং এ-আই-সি-সি-টি-ইউ যে আরও দক্ষিন দিকে তামিড় জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকেছে, ইদানিংকালের অনশনের পরে যে স্লোগানগুলি দিয়েছিল, তা শুনেই সেটা বোঝা যায়। "এ-আই-সি-সি-টি-ইউ-এর জয়" বা "ইনকিলাব জিন্দাবাদ" বা বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক্‌-এর মতন বিপ্লবী স্লোগান বিসর্জন দিয়ে এ-আই-সি-সি-টি-ইউ-এর নেতারা তামিলনাড়ু-র আঞ্চলিক দলগুলির বহুব্যবহৃত স্লোগান "ভেল্কা তামিড়" বা তামিলের জয়-এর মতন স্লোগান দিয়েছিল। এই স্লোগানগুলির মধ্যে দিয়ে এ-আই-সি-সি-র নেতারা প্রতিক্রিয়াশীল জাতিগত-সাম্প্রদায়িক দিক দিয়ে শ্রমিকদের ভাগ করতে চাইছে এবং তামিলনাড়ুর আঞ্চলিক পুঁজিবাদী দলগুলির সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে।

এ-আই-সি-সি-টি-ইউ-এর নেতারা স্তালীনপন্থী সিপিএম-এর ইউনিয়ন ফেডারেশন সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস বা সিটু-র জয়গান করে তাদের শ্রমিক অধিকারের "যোদ্ধা" বলে অভিহিত করছে। সিটু বহুদিন ধরেই ধর্মঘটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, যেমন গত ডিসেম্বরে ইয়ামাহা মোটরগাড়ি শ্রমিকদের লড়াইয়ে। সিটু ইয়ামাহার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে "শিল্পে শান্তি"-র আহ্বান করে এবং বসে ধর্মঘট আটকে দেয়।

এ-আই-সি-সি-টি-ইউ নেতারা প্রতিবেশী রাজ্য কর্ণাটকের বিদাদিতে মাদারসন কারখানায় সিটু-অনুমোদিত ইউনিয়নের একটি মিথ্যা "সংহতি প্রদর্শন" করার আয়োজন করেছে। সিটু-অনুমোদিত ইউনিয়নের কর্মকর্তারা ৪ঠা অক্টোবর মাদারসনের ধর্মঘটিদের কাছে গিয়ে তাদের ধর্মঘটের সমর্থনে ৫০০০ টাকা দান করেন এবং কেবলমাত্র মৌখিক ভাবে "সমর্থন" ঘোষণা করেন। কিন্তু শ্রীপেরুম্বুদুরের ধর্মঘটি শ্রমিকদের সমর্থনে কর্ণাটকের মাদারসনের শ্রমিকদের কোনো রকম আন্দোলনে জড়ানোর তারা বিরোধীতা করেন।

জঙ্গী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মেট-এর আক্রমণও আবার সাধারণ দাবিতে সব শ্রমিকদের একত্রিত সংগ্রাম সংগঠিত করার এবং শ্রমিকদের সংগ্রামকে একঘরে করার জন্য এ-আই-সি-সি-টি-ইউ এবং সিটু বিশ্বাসঘাতকের মত যে প্রচেষ্টা করছে তার বিরুদ্ধে কমিটি গঠন করার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করল।

মাদারসন ধর্মঘটের ওপর ডাব্লু-এস- ডাব্লু-এস-এ ইদানিংকালে প্রকাশিত প্রবন্ধ ডাব্লু-এস- ডাব্লু-এস সমর্থকরা চেন্নাই অঞ্চলের সংস্থার অন্যান্য কারখানায় বিলি করেছে। তারা শ্রীপেরুম্বুদুরের কারখানায় কিছু অস্থায়ী কর্মীর সঙ্গে দেখা করেছে এবং এই ধর্মঘট যে রাজনৈতিক প্রশ্নের অবতরণ করেছে তা নিয়ে ও ডাব্লু-এস-ডাব্‌লু-এস-এর বিকল্প সমাজতান্ত্রিক কার্য্যক্রমের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছে।

অস্থায়ী কর্মীরা ধর্মঘটের প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছে, এবং একই সঙ্গে অভিযোগ করেছে যে ইউনিয়ন তাদের কাছে সমর্থনের আবেদন করেনি। ভদ্র মজুরি ও কাজের পরিবেশ এবং অস্থায়ী শ্রম ব্যবস্থা শেষ করার জন্য ডাব্লু-এস-ডাব্লু-এস সব শ্রমিকদের একত্রিত সংগ্রামের যে ডাক দিয়েছে, নিজেদের দুর্বল কর্মাবস্থা সত্ত্বেও এই শ্রমিকরা তাকে স্বাগত জানিয়েছে।